
জিয়া চৌধুরী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক পর এমন একটি নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে প্রধান দলগুলো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছে এবং ভোটাররা তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক প্রেক্ষাপটে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পেয়েছেন। একমাত্র আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি; বাকী প্রায় সব উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল।এই নির্বাচনের ফলাফলে রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়—চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিএনপির একচেটিয়া প্রভাব দৃশ্যমান; অন্যদিকে খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পেয়েছে। ঢাকার আসনগুলোতে দুই দলের প্রভাব প্রায় সমানতালে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র একধরনের ভৌগোলিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের জন্য বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের কারচুপি বা ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর অভিযোগ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়নি। জামায়াতে ইসলামী তাদের ফলাফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার ঘোষণা দিয়েছে। এই অবস্থান সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, যদি সংসদে নীতিনির্ভর বিতর্ক, কমিটি কার্যক্রম ও জবাবদিহিমূলক চর্চা শক্তিশালী হয়।
তবে নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বড় পরীক্ষা শুরু হচ্ছে এখন—শাসনক্ষমতায় আসীন দলের জন্য। বিএনপির সামনে একাধিক কাঠামোগত ও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। নির্বাচনের পর অনেক সময় দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি বা সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি হয়। সরকার যদি শুরুতেই কঠোর বার্তা না দেয় এবং প্রশাসনিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিশ্চিত না করে, তাহলে বিজয়ের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা—এসবই তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানিনির্ভর ও বহুমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশল জরুরি। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে আইটি, ফার্মাসিউটিক্যাল, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও হালাল পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত সংস্কার। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো শক্তিশালী করা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা বিস্তার, মেডিকেল শিক্ষায় মানোন্নয়ন—এসব ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থা টেকসই হবে না। শিক্ষা খাতে গবেষণা ও উদ্ভাবনকেন্দ্রিক বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন এবং কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ সময়ের দাবি।
চতুর্থত, ডিজিটাল ও প্রযুক্তি খাত। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আইটি সেক্টরে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে নীতি সহায়তা এবং সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তিকে কেবল সেবা খাত নয়, উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পঞ্চমত, দুর্নীতি দমন ও আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধ। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ ও অনিয়ম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, অর্থ পাচার, হুন্ডি ও সোনা চোরাচালান বন্ধে সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুততর করা না গেলে অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যকর হবে না।
সবশেষে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং অতীতের শাসনব্যবস্থার ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া—এটাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরীক্ষা। বিরোধী মত দমন নয়, বরং সহনশীলতা, সংসদীয় বিতর্ক ও অংশগ্রহণমূলক নীতিনির্ধারণই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন প্রশ্ন একটাই—এই ম্যান্ডেট কি কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসনের মাধ্যমে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ নেবে, নাকি এটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে। ইতিহাসের চোখ এখন নতুন সরকারের দিকে।
www.ctgmirror.com. এটি একটি জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ পোর্টাল, যা সাহসী অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে
তাৎক্ষণিক খবর, জাতীয়, রাজনীতি,অর্থনীতি, বিনোদন, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলার আপডেট দেয়।
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ মঈনুদ্দিন কাদেরী শওকত, সম্পাদকঃ জিয়া চৌধুরী।